কলকাতাকে একরকম রাজনৈতিক এলাকা বলে পড়া যায় না। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় এটি শাসকদলের শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, উত্তর কলকাতার পুরনো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, মধ্য কলকাতার বাণিজ্যিক ও বহুস্তরীয় জনবিন্যাস, দক্ষিণ কলকাতার মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত বেল্ট, আর বন্দর-সংলগ্ন শ্রমজীবী অঞ্চল—সব মিলিয়ে কলকাতা আসলে এক শহরের ভিতরে কয়েকটি আলাদা রাজনৈতিক জগত। ফলে এখানকার ভোটও একমাত্রিক নয়।
কলকাতার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য হল নাগরিক পরিষেবা ও রাজনৈতিক ব্যবহারের প্রশ্ন। এখানে রাস্তা, নিকাশি, আবর্জনা, জল, ট্রাফিক, হাসপাতাল, স্কুল, বাজার, পার্কিং, পুরসভার কাজ, পুরনো বাড়ি বনাম নতুন আবাসন—এসবই ভোটের বড় ইস্যু। কিন্তু শহরের ভোট কেবল পরিষেবার উপর দাঁড়ায় না। মানুষ এটাও দেখেন, কে রাজনৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য, কে নাগরিক ভাষায় কথা বলে, আর কে শুধু দলীয় শক্তির জোরে রাজনীতি করতে চায়। তাই কলকাতার ভোটে ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক ব্যবহার এবং শহুরে মানসিকতা বড় ফ্যাক্টর।
উত্তর কলকাতা
শ্যামপুকুর, মানিকতলা, কাশীপুর-বেলগাছিয়া, এন্টালি, বেলেঘাটার মতো এলাকায় ভোটের চরিত্র গড়ে ওঠে ঘনবসতি, পুরনো পাড়া-সংস্কৃতি, ছোট ব্যবসা, বাজার, রাস্তা, পুরসভার পরিষেবা এবং দলীয় নেটওয়ার্ককে ঘিরে। এখানে তৃণমূলের সংগঠনগত শক্তি বড় সুবিধা দেয়। বিজেপির উপস্থিতি থাকলেও সব আসনে তারা সমান শক্তিশালী নয়। উত্তর কলকাতার বহু অংশে তৃণমূলের সামাজিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি এখনও যথেষ্ট মজবুত।
মধ্য কলকাতা ও বন্দর বেল্ট
কলকাতা পোর্ট, চৌরঙ্গী, বউবাজার-সংলগ্ন বলয় এবং বন্দর-শ্রমজীবী অংশে ভোটের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মুসলিম ভোট, ছোট ব্যবসা, ঘনবসতি, বাজার, পরিবহণ, অনানুষ্ঠানিক শ্রম এবং স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাব। এই অংশে তৃণমূলের সুবিধা সাধারণত বেশি, কারণ তাদের সংগঠন, স্থানীয় মুখ এবং সামাজিক জোট বিস্তৃত। বিজেপি এখানে উপস্থিত থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠতে পারেনি।
দক্ষিণ কলকাতা
ভবানীপুর, রাসবিহারী, বালিগঞ্জের মতো এলাকায় ভোটের ভাষা অনেক বেশি মধ্যবিত্ত, ইমেজ-নির্ভর এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। এখানে ভোটাররা শুধু সংগঠন বা দলীয় আনুগত্যে ভোট দেন না; তারা প্রার্থীর ভাবমূর্তি, রাজনৈতিক আচরণ, শহুরে রুচি এবং বিকল্পের গ্রহণযোগ্যতাও বিচার করেন। এই অংশে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও বিজেপি কিছু আসনে দৃশ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বী। বামকেও পুরোপুরি অদৃশ্য বলা যাবে না। শিক্ষিত, ঐতিহাসিকভাবে রাজনৈতিকভাবে সচেতন কিছু অংশে বামের মানসিক উপস্থিতি এখনও পুরো মুছে যায়নি, যদিও বাস্তব আসন-লড়াই এখন প্রধানত তৃণমূল বনাম বিজেপির।
কলকাতার পুরসভা-নির্ভর রাজনীতি
কলকাতার রাজনীতি বোঝার জন্য আরেকটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—এটি সম্পূর্ণভাবে পুরসভা-নির্ভর রাজনৈতিক ভূখণ্ড। এখানে ভোটের বড় অংশ নির্ভর করে স্থানীয় কাউন্সিলর, ওয়ার্ড-স্তরের নেটওয়ার্ক, স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান, এবং “কাজ করিয়ে দেওয়ার” ক্ষমতার উপর। এই জায়গায় তৃণমূলের স্পষ্ট সুবিধা আছে। কারণ শহরের অনেক অংশে তাদের সংগঠন শুধু নির্বাচনী নয়, প্রশাসনিক ও সামাজিক উপস্থিতির সঙ্গেও জড়িত। বিজেপি কিছু আসনে বিরোধী ভোটের ধারক হিসেবে শক্তি দেখাতে পারে, কিন্তু শহর জুড়ে সেই ওয়ার্ড-স্তরের গভীরতা তাদের এখনও সর্বত্র নেই।
সামগ্রিক ছবি
সামগ্রিকভাবে কলকাতায় তৃণমূলই স্পষ্টভাবে এগিয়ে। তবে এই এগিয়ে থাকা সব অংশে একরকম নয়। উত্তর ও মধ্য কলকাতার বহু অংশে তৃণমূলের প্রাধান্য বেশি স্থিতিশীল। দক্ষিণ কলকাতার কিছু আসনে বিজেপি তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান। বাম সীমিত হলেও কিছু শহুরে মানসিক পরিসরে এখনও উপস্থিত। ফলে কলকাতাকে পুরোপুরি একতরফা বলা সহজ হলেও, বাস্তবে শহরের কিছু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাত্রা বাকিগুলোর তুলনায় বেশি।
যেসব আসনে লড়াই বেশি নজরে রাখার মতো
কলকাতায় বিশেষভাবে নজরে রাখার মতো আসন হল ভবানীপুর, রাসবিহারী, বালিগঞ্জ, শ্যামপুকুর, মানিকতলা, এন্টালি, বেলেঘাটা। তবে সব আসনে লড়াইয়ের চরিত্র এক নয়। কোথাও তৃণমূলের সুবিধা বেশি, কোথাও বিজেপি তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান, আবার কোথাও বিরোধী ভোটের প্রকৃতি ফলের ব্যবধান কমিয়ে দিতে পারে।
এক লাইনে কলকাতার সার কথা হল:
এখানে ভোট শুধু দলের নয়; নাগরিক পরিষেবা, রাজনৈতিক ব্যবহার, স্থানীয় নেটওয়ার্ক, আর এক শহরের ভিতরে বহু রকম সামাজিক বাস্তবতার ভোট।