উত্তর ২৪ পরগনাকে একরকম জেলা বলে পড়া যায় না। এই জেলার একদিকে বনগাঁ-সংলগ্ন সীমান্ত ও মতুয়া-প্রভাবিত বেল্ট, অন্যদিকে বসিরহাট-হাড়োয়া-দেগঙ্গার সংখ্যালঘু-প্রধান অঞ্চল, আবার ব্যারাকপুর শিল্প-শহরতলি বলয়, বারাসত-মধ্যমগ্রাম-নিউ টাউনের দ্রুত নগরায়িত অংশ, আর কোথাও পুরসভা-নির্ভর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। ফলে এখানে ভোটও একমাত্রিক নয়। এই জেলার নির্বাচন আসলে এক জায়গায় একরকম, আরেক জায়গায় সম্পূর্ণ অন্যরকম।
এই জেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার বহুস্তরীয় সামাজিক ও ভৌগোলিক চরিত্র। উত্তর ২৪ পরগনায় সীমান্ত আছে, উদ্বাস্তু ইতিহাস আছে, দ্রুত নগরায়ন আছে, ঘনবসতি আছে, পুরনো শিল্পাঞ্চল আছে, সংখ্যালঘু-প্রধান গ্রামীণ অঞ্চল আছে, আবার নতুন মধ্যবিত্ত বেল্টও আছে। তাই এখানে কোনও একটিমাত্র ইস্যু পুরো জেলাকে চালায় না। কোথাও নাগরিকত্ব ও পরিচয়ের প্রশ্ন বড়, কোথাও নিরাপত্তা ও সামাজিক আস্থা, কোথাও রাস্তা-ড্রেনেজ-পানীয় জল, কোথাও শিল্প-পশ্চাদপসরণ ও কর্মসংস্থান, আর কোথাও কেবল স্থানীয় সংগঠন আর প্রভাবের রাজনীতি।
জেলার এক বড় অংশে, বিশেষ করে বনগাঁ-সংলগ্ন সীমান্ত বেল্টে, উদ্বাস্তু পরিচয়, মতুয়া আবেগ, নাগরিকত্বের প্রশ্ন এবং সীমান্তবাস্তবতা দীর্ঘদিন ধরেই রাজনীতির কেন্দ্রে। এখানে বিজেপির উপস্থিতি বাস্তব, কারণ তারা পরিচয়-নির্ভর অসন্তোষ, উদ্বাস্তু স্মৃতি এবং শাসকদলবিরোধী ভোটকে একত্রিত করতে পেরেছে। কিন্তু তৃণমূলও পুরোপুরি পিছিয়ে নেই, কারণ কল্যাণমূলক প্রকল্প, স্থানীয় সংগঠন এবং প্রশাসনিক পৌঁছনো এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই অংশে লড়াই অনেক সময় সরাসরি তৃণমূল বনাম বিজেপি।
অন্যদিকে বসিরহাট, হাড়োয়া, মিনাখাঁ, দেগঙ্গা, বাদুড়িয়া, সন্দেশখালি-সংলগ্ন বেল্টে ভোটের মানসিকতা অন্যরকম। এখানে সংখ্যালঘু ভোট, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় আস্থা, প্রশাসনিক আচরণ, এবং প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন অনেক বড়। এই অংশে তৃণমূল তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী, কারণ সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক, স্থানীয় সংগঠন এবং শাসকদল হিসেবে তাদের পৌঁছনো বেশি। কিন্তু এখানেও অসন্তোষ জমতে পারে, বিশেষ করে যদি মানুষ মনে করেন স্থানীয় সমস্যা, নিরাপত্তা, বা পরিষেবা যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। এই অঞ্চলে বিজেপি উপস্থিত থাকলেও সব জায়গায় তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। কিছু এলাকায় বাম-আইএসএফ জোটও সীমিত পরিসরে বিরোধী ভোটের মানসিকতায় ঢুকে পড়তে পারে।
ব্যারাকপুর শিল্প-শহরতলি বেল্ট উত্তর ২৪ পরগনার আরেকটি বড় রাজনৈতিক অঞ্চল। নৈহাটি, ভাটপাড়া, জগদ্দল, নোয়াপাড়া, ব্যারাকপুর, বীজপুর—এই অংশে ঘনবসতি, পুরনো শিল্পের স্মৃতি, শ্রমজীবী এলাকা, পৌর পরিষেবা, রাস্তা, জলনিকাশি, স্থানীয় গোষ্ঠী-প্রভাব, এবং দলীয় সংগঠন—সব একসঙ্গে রাজনীতি তৈরি করে। এখানে তৃণমূল ও বিজেপির সরাসরি লড়াই বেশি দৃশ্যমান। বিজেপি এই বেল্টে বাস্তব শক্তি, কারণ শাসকদলবিরোধী শহরতলি ভোট এবং কিছু শিল্পাঞ্চল-জাত ক্ষোভ তারা ধরতে পেরেছে। কিন্তু তৃণমূলও এখানে প্রবলভাবে লড়াইয়ে থাকে, কারণ তাদের সংগঠন, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং পুরসভা-নির্ভর নেটওয়ার্ক শক্তিশালী। বাম এই অংশে পুরনো স্মৃতি হিসেবে আছে, কিন্তু মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রে নয়।
বারাসত-মধ্যমগ্রাম-নিউ টাউন-রাজারহাট-সংলগ্ন নগরায়িত অংশে ভোটের চরিত্র আরও আলাদা। এখানে নাগরিক পরিষেবা, রাস্তা, ড্রেনেজ, আবাসন, দ্রুত নগরায়ন, জমির ব্যবহার বদল, কাজ, শিক্ষা, হাসপাতাল, এবং মধ্যবিত্তের প্রত্যাশা বড় ভূমিকা নেয়। এই অংশে মানুষ দলকে শুধু আবেগে নয়, কার্যকারিতার ভিত্তিতেও বিচার করেন। শাসকদল এখানে এগিয়ে থাকতে পারে, কারণ সংগঠন, প্রশাসনিক যোগাযোগ এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন তাদের পক্ষে কাজ করে। কিন্তু বিজেপিও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশেষ করে যেখানে শহরতলি-নির্ভর অসন্তোষ বা বিরোধী মনোভাব জমছে। এই বেল্টে বাম সীমিত হলেও শিক্ষিত ভোটারদের একাংশের মধ্যে মানসিক উপস্থিতি পুরো হারায়নি।
উত্তর ২৪ পরগনার আরেকটি বড় বাস্তবতা হল পুরসভা-রাজনীতি ও স্থানীয় নেটওয়ার্ক। এই জেলায় ভোট অনেক সময় রাজ্যস্তরের স্লোগানে নয়, বরং পুরসভা, কাউন্সিলর, ব্লক, স্থানীয় নেতা, ক্লাব-সংস্কৃতি, এবং প্রশাসনিক কাজে কে কতটা সাহায্য করছে—সেই বাস্তবতায় নির্ধারিত হয়। এই কারণেই উত্তর ২৪ পরগনায় শুধু বড় নেতা নয়, স্থানীয় সংগঠনের গভীরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল এই জেলায় দীর্ঘদিন ধরে সেই নেটওয়ার্কের সুবিধা পেয়েছে। বিজেপি কিছু বেল্টে সেই জমি কাটতে পেরেছে, কিন্তু সব অংশে একইভাবে নয়।
বামের অবস্থান উত্তর ২৪ পরগনায় পুরোপুরি মুছে যায়নি, কিন্তু তারা এখন মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রে নেই। শহরতলি ও শিক্ষিত কিছু অংশে, বা যেখানে ভোটাররা তৃণমূল ও বিজেপি—দু’টির বাইরেও একটি রাজনৈতিক ভাষা খোঁজেন, সেখানে বাম মানসিক উপস্থিতি রাখে। কিন্তু জেলাজুড়ে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন প্রধানত তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেই। সংখ্যালঘু-প্রধান কিছু pockets-এ বাম-আইএসএফ ধরনের বিকল্প কিছুটা আলোচনায় থাকতে পারে, কিন্তু তা এখনও সীমিত।
সামগ্রিকভাবে উত্তর ২৪ পরগনার ছবিতে তৃণমূলই এগিয়ে, কারণ জেলার বহু অংশে তাদের সংগঠন, স্থানীয় নেটওয়ার্ক, সামাজিক জোট এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ মজবুত। কিন্তু এই এগিয়ে থাকা সব জায়গায় সমান নয়। সীমান্ত ও মতুয়া-প্রভাবিত বেল্টে বিজেপি বাস্তব চ্যালেঞ্জার, ব্যারাকপুর শিল্প-শহরতলি বলয়ে তৃণমূল-বিজেপির টানটান লড়াই, সংখ্যালঘু-প্রধান বসিরহাট বেল্টে তৃণমূলের সুবিধা বেশি, আর নগরায়িত মধ্যবিত্ত বেল্টে ফল অনেক সময় কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভর করে। তাই উত্তর ২৪ পরগনাকে একটিমাত্র নির্বাচনী মানচিত্র বলে দেখলে ভুল হবে।
যে ক’টি আসনে লড়াই তুলনামূলকভাবে বেশি নজরে রাখার মতো, তার মধ্যে বনগাঁ উত্তর, বনগাঁ দক্ষিণ, গাইঘাটা, বাগদা, ভাটপাড়া, নৈহাটি, জগদ্দল, ব্যারাকপুর, নোয়াপাড়া, বারাসত, দেগঙ্গা, হাড়োয়া, মিনাখাঁ, বসিরহাট দক্ষিণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তবে এদের প্রত্যেকটিতে লড়াইয়ের চরিত্র এক নয়। কোথাও তৃণমূল বনাম বিজেপি, কোথাও তৃণমূলের স্পষ্ট সুবিধা, কোথাও বিরোধী ভোটের ভাঙন, আবার কোথাও স্থানীয় প্রভাব ও সংগঠন ফল ঠিক করে দিতে পারে।
এক লাইনে উত্তর ২৪ পরগনার সার কথা হল:
এখানে ভোট শুধু দলের নয়; সীমান্ত, পরিচয়, নাগরিক পরিষেবা, সামাজিক আস্থা, আর ঘনবসতিপূর্ণ শহরতলির প্রতিদিনের বাস্তবতার ভোট।