বাঁকুড়া: জঙ্গলমহলের মাটি, খরা, কাজ, আদিবাসী-গ্রামীণ সমাজ আর বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জেলা

বাঁকুড়াকে একরকম জেলা বলে পড়া যায় না। এটি জঙ্গলমহলের অংশ, কিন্তু পুরো জেলায় এক ধরনের ভোটের মানসিকতা কাজ করে না। কোথাও খরা ও জলকষ্ট বড় প্রশ্ন, কোথাও আদিবাসী ও তফসিলি সমাজের প্রতিনিধিত্ব, কোথাও গ্রামীণ রাস্তা ও ভাতা, কোথাও ছোট শহর ও আধা-শহুরে পরিষেবা, আবার কোথাও তৃণমূল ও বিজেপির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবচেয়ে স্পষ্ট। বাঁকুড়া একমুখী জেলা নয়; এখানে লড়াই অঞ্চলভেদে বদলে যায়।

বাঁকুড়ার সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হল জল, কাজ আর অনিশ্চিত জীবিকা। জেলার বহু অংশে কৃষি পুরোপুরি নিশ্চিন্ত নয়, জলাভাব একটি পুরনো সমস্যা, আর বহু পরিবারকে কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়। ফলে এখানে ভোটের সময় বড় প্রতিশ্রুতির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় খুব বাস্তব প্রশ্ন—সেচ কতটা মিলছে, রাস্তা হয়েছে কি না, গ্রামে কাজ আছে কি না, সরকারি প্রকল্প নিচুতলা পর্যন্ত পৌঁছচ্ছে কি না, এবং মানুষকে বারবার বাইরে যেতে হচ্ছে কি না। এই কারণেই বাঁকুড়ায় উন্নয়নের ভাষা অনেক বেশি ব্যবহারিক।

দ্বিতীয় বড় প্রশ্ন হল আদিবাসী, তফসিলি ও প্রান্তিক গ্রামীণ সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান। রানিবাঁধ, রাইপুর, সলতোড়া, সোনামুখী, ইন্দাস, কাটুলপুর—এই ধরনের আসনে সামাজিক প্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় মুখ, এবং সরকারি সুবিধার বাস্তব পৌঁছনো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ভোট শুধু দল দেখে পড়া যায় না; দেখতে হয় কে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, কে নিয়মিত এলাকায় থাকে, আর কে শুধু নির্বাচনের সময় দৃশ্যমান হয়।

তৃতীয় বড় বিষয় হল জঙ্গলমহলের উন্নয়ন-পরবর্তী রাজনীতি। এক সময় এই অঞ্চলে নিরাপত্তা ও অশান্তির প্রশ্ন বড় ছিল। এখন তার জায়গায় এসেছে রাস্তা, আবাস, ভাতা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্কুল, পানীয় জল এবং প্রশাসনিক উপস্থিতির প্রশ্ন। কিন্তু এখানেও মানুষ শুধু ঘোষণা শোনেন না; তারা দেখেন কাজটা টেকসই কি না। তাই বাঁকুড়ায় রাজনৈতিক লড়াই অনেক সময় এই প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়—কারা উন্নয়নের কথা বলছে, আর কারা উন্নয়নকে চোখে পড়ার মতো করে দেখাতে পারছে।

জেলাকে মোটামুটি কয়েকটি বেল্টে পড়া যায়।

প্রথমত, আদিবাসী-প্রধান ও জঙ্গলমহল বেল্ট। এখানে জল, রাস্তা, বন, কাজ, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় সম্মান—সব একসঙ্গে কাজ করে। এই অংশে তৃণমূল কিছু জায়গায় শক্তি ধরে রেখেছে, বিশেষ করে যেখানে কল্যাণমূলক রাজনীতি ও স্থানীয় নেতৃত্ব কাজ করছে। কিন্তু বিজেপিও এখানে বাইরে নয়, কারণ জঙ্গলমহলে তারা গত কয়েক বছরে সামাজিক-রাজনৈতিক জমি করেছে। ফলে এই বেল্ট পুরোপুরি কারও নয়।

দ্বিতীয়ত, শহর-সংলগ্ন ও আধা-শহুরে বেল্ট—যেমন বাঁকুড়া, বড়জোড়া, ওন্দা, বিষ্ণুপুর। এখানে ভোটের প্রশ্ন কিছুটা আলাদা। কাজ, ছোট ব্যবসা, শহর-গ্রামের যোগাযোগ, হাসপাতাল, শিক্ষা, পৌর পরিষেবা, রাস্তা—এসব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই অংশে বিজেপি বহু জায়গায় শক্তিশালী থেকেছে, বিশেষ করে যেখানে শাসকদলবিরোধী ভোট তাদের দিকে গিয়েছে। কিন্তু তৃণমূল যদি স্থানীয় ক্ষোভ কমাতে পারে এবং পরিষেবা-ভিত্তিক সুবিধা তুলে ধরতে পারে, তাহলে এই বেল্টও একতরফা থাকে না।

তৃতীয়ত, তফসিলি ও কৃষিনির্ভর গ্রামীণ বেল্ট—যেমন সলতোড়া, কাটুলপুর, ইন্দাস, সোনামুখী। এখানে সামাজিক সুরক্ষা, ভাতা, আবাস, গ্রামীণ রাস্তা, চাষের অবস্থা এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ—এসব খুব বড় ফ্যাক্টর। এই অংশে বিজেপি শক্ত অবস্থানে থেকেছে, তবে তৃণমূলও লড়াইয়ে আছে। ফলে এই বেল্টে ফল অনেক সময় নির্ভর করে কারা প্রান্তিক ভোটারদের বেশি বিশ্বাস জোগাতে পারছে তার উপর।

বামের অবস্থান বাঁকুড়ায় পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু তারা মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রে নেই। জেলার পুরনো রাজনৈতিক ইতিহাসে বামপন্থার শিকড় ছিল, বিশেষ করে গ্রামীণ ও শ্রমভিত্তিক রাজনীতিতে। এখন তাদের উপস্থিতি সীমিত, তবে কিছু আসনে বিরোধী ভোটের মেজাজে বা রাজনৈতিক ভাষায় তারা এখনও একেবারে অনুপস্থিত নয়। বাস্তব লড়াই অবশ্য এখন প্রধানত তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যেই।

সামগ্রিকভাবে বাঁকুড়ার ছবিতে বিজেপি এখনও খুব শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী, এবং জেলার বড় অংশে তাদের বাস্তব ভিত্তি আছে। কিন্তু তৃণমূলও নির্দিষ্ট বেল্টে কার্যকরভাবে লড়াইয়ে আছে, বিশেষ করে জঙ্গলমহল-সংলগ্ন ও কিছু গ্রামীণ-কল্যাণনির্ভর অঞ্চলে। ফলে বাঁকুড়াকে একক ছকে ফেলা যায় না। এটি এমন একটি জেলা, যেখানে জলকষ্ট, কাজের অভাব, সামাজিক প্রতিনিধিত্ব, জঙ্গলমহলের উন্নয়ন, আর শাসকদলবিরোধী মেজাজ—সব মিলিয়ে ভোটের ফল তৈরি হয়।

যে আসনগুলিতে লড়াই বিশেষ নজরে রাখার মতো, তার মধ্যে বাঁকুড়া, বড়জোড়া, সলতোড়া, রানিবাঁধ, রাইপুর, ওন্দা, বিষ্ণুপুর, ইন্দাস এবং সোনামুখী গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও বিজেপি সুবিধাজনক, কোথাও তৃণমূল চ্যালেঞ্জ ছুড়ছে, আর কোথাও ব্যবধান এমন যে স্থানীয় প্রার্থী ও সংগঠনই ফল ঘুরিয়ে দিতে পারে।

এক লাইনে বাঁকুড়ার সার কথা হল:
এখানে ভোট শুধু দলের নয়; জল, কাজ, সামাজিক সম্মান, আর জঙ্গলমহলের বদলে যাওয়া বাস্তবতার ভোট।

Leave a Reply