হুগলি: শিল্প, কৃষি, শহরতলি, পুরনো বামভিত্তি আর নতুন তৃণমূল-বিজেপি প্রতিযোগিতার এক বহুস্তরীয় জেলা

হুগলিকে একক রাজনৈতিক মানচিত্র হিসেবে পড়া যায় না। এই জেলার একদিকে গঙ্গার ধারের পুরনো শিল্পাঞ্চল, অন্যদিকে উর্বর কৃষিবেল্ট, কোথাও শহরতলি ও দ্রুত বদলে যাওয়া আবাসন-বাস্তবতা, কোথাও ছোট শহর, কোথাও আবার পুরনো বাম রাজনীতির দীর্ঘ স্মৃতি। ফলে হুগলির ভোটও একরকম নয়। এখানে শিল্পের সংকট, কৃষির স্থায়িত্ব, জমির প্রশ্ন, স্থানীয় পরিষেবা, যাতায়াত, রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তি এবং প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা—সব মিলিয়ে নির্বাচনের মেজাজ তৈরি হয়।

এই জেলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এর দ্বৈত অর্থনীতি। একদিকে শ্রীরামপুর-চন্দননগর-চুঁচুড়া-হুগলি-সংলগ্ন শিল্প ও শহুরে বেল্ট, অন্যদিকে তারকেশ্বর, পাণ্ডুয়া, ধনিয়াখালি, হরিপাল, পুরশুড়া, আরামবাগ, খানাকুল-সংলগ্ন কৃষিনির্ভর অঞ্চল। ফলে জেলার এক অংশে মানুষ ভাবছেন শিল্প, কাজ, ছোট ব্যবসা, রাস্তা, পৌর পরিষেবা ও যাতায়াত নিয়ে; অন্য অংশে মানুষ বেশি ভাবছেন চাষ, সেচ, ফসলের দাম, গ্রামীণ রাস্তা, সেচ, এবং সরকারি প্রকল্পের পৌঁছনো নিয়ে। এই কারণেই হুগলিতে একটিমাত্র উন্নয়নের ভাষা কাজ করে না।

শিল্পাঞ্চল ও শহর-সংলগ্ন অংশে প্রধান প্রশ্ন হল পুরনো শিল্পভিত্তির দুর্বলতা এবং নতুন কাজের অভাব। গঙ্গার ধার ঘেঁষা বহু পুরনো এলাকার মানুষের জীবনে শিল্পের স্মৃতি আছে, কিন্তু সেই স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের বাস্তবতার মিল সবসময় নেই। ছোট ব্যবসা, পরিষেবা, স্থানীয় বাজার, পরিবহণ, শিক্ষা, হাসপাতাল, নাগরিক পরিকাঠামো—এসবই এখানে বড় ইস্যু। এই অংশে ভোটাররা সাধারণত রাজনৈতিক আচরণ, প্রার্থীর ভাবমূর্তি, শহুরে পরিষেবার মান, এবং বিরোধী শক্তির গ্রহণযোগ্যতা—সবই বিচার করেন। তৃণমূল এই অংশে সংগঠন ও প্রশাসনিক নেটওয়ার্কের জোরে এগিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু বিজেপিও এখানে বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে শাসকদলবিরোধী মনোভাব আছে। বামও এই বেল্টে পুরোপুরি অদৃশ্য নয়, কারণ হুগলির শহরাঞ্চলে তাদের পুরনো রাজনৈতিক স্মৃতি এখনও আছে।

অন্যদিকে কৃষিনির্ভর অংশে ভোটের ভাষা আলাদা। ধনিয়াখালি, পাণ্ডুয়া, তারকেশ্বর, হরিপাল, পুরশুড়া, আরামবাগ, খানাকুলের মতো অঞ্চলে মানুষের প্রধান প্রশ্ন কৃষি, সেচ, রাস্তা, গ্রামীণ কাজ, ফসলের দাম, বাজারে পৌঁছনোর সুযোগ এবং সরকারি সুবিধা ঘিরে। এখানে ভোট অনেক সময় খুবই ব্যবহারিক। কে রাস্তা করেছে, কে জল এনেছে, কে সেচের সমস্যায় পাশে দাঁড়িয়েছে, কে গ্রামে নিয়মিত থাকছে—এসবই বড় ফ্যাক্টর। তৃণমূল এই অংশে কল্যাণমূলক প্রকল্প, পঞ্চায়েত-ভিত্তিক সংগঠন এবং প্রশাসনিক পৌঁছনোর কারণে এগিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু কৃষি-অসন্তোষ, স্থানীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব বা পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ জমলে বিজেপি সেখানে জায়গা পেতে পারে। কিছু pockets-এ বামের পুরনো শক্তির স্মৃতিও এখনও পুরো মুছে যায়নি।

হুগলির রাজনীতি বুঝতে গেলে সিঙ্গুর-এর কথাও এড়ানো যায় না। সিঙ্গুর কেবল একটি বিধানসভা আসন নয়; এটি জমি, শিল্প, কৃষি এবং রাজনৈতিক স্মৃতির এক বড় প্রতীক। যদিও সেই আন্দোলনের সময় অনেকটা পেরিয়ে গেছে, তবু জেলার রাজনৈতিক চেতনার ভিতরে সিঙ্গুর এখনও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী উপস্থিতি রাখে। এই কারণেই হুগলিতে শিল্প বনাম জমি—এই বিতর্ক পুরোপুরি ইতিহাস হয়ে যায়নি; তা নতুন রূপে এখনও রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বে কাজ করে।

এই জেলার আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল পুরনো বামভিত্তির স্মৃতি। হুগলির বহু অংশে একসময় বাম শক্তির গভীর প্রভাব ছিল। সেই সংগঠনগত ভিত্তি এখন আর আগের মতো নেই, কিন্তু স্মৃতি ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পুরোপুরি হারায়নি। বিশেষ করে শহরাঞ্চল, শিক্ষিত ভোটার-প্রধান এলাকা, বা কিছু কৃষিবেল্টে বামের উপস্থিতি আজও সরাসরি জয়ের না হলেও আলোচনার বিষয়। ফলে হুগলিতে বিরোধী পরিসর সবসময় শুধু বিজেপির একাধিপত্যে চলে যায় না; কোথাও কোথাও বাম এখনও বিরোধী রাজনীতির ভাষায় উপস্থিত।

সামগ্রিকভাবে হুগলির ছবিতে তৃণমূলই এগিয়ে, কারণ জেলার বহু অংশে তাদের সংগঠন, জনপ্রতিনিধিত্ব, এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ মজবুত। কিন্তু এই এগিয়ে থাকা সব জায়গায় সমান নয়। শহর-শিল্পাঞ্চল বেল্টে বিজেপি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে। কৃষিবেল্টে তৃণমূলের সুবিধা বেশি, কিন্তু সেখানে স্থানীয় ক্ষোভ বা প্রার্থী-ফ্যাক্টর গুরুত্বপূর্ণ। বাম সীমিত হলেও কিছু আসনে সরাসরি ফল না করলেও মেজাজে প্রভাব ফেলতে পারে। এই কারণেই হুগলিকে একতরফা জেলা বলা যাবে না। এটি এমন একটি জেলা, যেখানে তৃণমূলের কাঠামোগত শক্তি, বিজেপির চ্যালেঞ্জ, আর বামের ঐতিহাসিক স্মৃতি—তিনটিই একসঙ্গে কাজ করে।

জেলার যে আসনগুলিতে লড়াই তুলনামূলকভাবে বেশি নজরে রাখার মতো, তার মধ্যে সিঙ্গুর, চন্দননগর, চুঁচুড়া, পাণ্ডুয়া, সপ্তগ্রাম, ধনিয়াখালি, তারকেশ্বর, হরিপাল, আরামবাগ ও খানাকুল গুরুত্বপূর্ণ। শহর-সংলগ্ন অংশে লড়াই বেশি হয় তৃণমূল বনাম বিজেপির, আর কিছু কৃষিবেল্টে তৃণমূলের সুবিধা থাকলেও বিরোধীরা চাপ তৈরি করতে পারে। কোথাও বামের পুরনো স্মৃতিও লড়াইকে সরল হতে দেয় না।

এক লাইনে হুগলির সার কথা হল:
এখানে ভোট শুধু দলের নয়; শিল্পের স্মৃতি, কৃষির বাস্তবতা, জমির প্রশ্ন, আর বদলে যাওয়া সামাজিক সমীকরণের ভোট।

Leave a Reply