দক্ষিণ ২৪ পরগনা: এক জেলার ভিতরে বহু বাস্তবতা, বহু ইস্যু, বহু ধরনের লড়াই

দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে একরকম জেলা বলে পড়া যায় না। এই জেলার একদিকে সুন্দরবনের অনিশ্চয়তায় ঘেরা দ্বীপাঞ্চল, অন্যদিকে দ্রুত বদলে যাওয়া শহরতলি, কোথাও কলকাতা-লাগোয়া মধ্যবিত্ত বেল্ট, কোথাও ভাঙড়ের মতো আলাদা রাজনৈতিক আবহ, আবার কোথাও মহেশতলা-মেটিয়াবুরুজের ঘনবসতিপূর্ণ শ্রমজীবী অঞ্চল। ফলে এখানকার ভোটও একমাত্রিক নয়। এই জেলার নির্বাচন আসলে একটিমাত্র সরল রাজনৈতিক লড়াই নয়; বরং বহু অঞ্চলের বহু আলাদা বাস্তবতার সমষ্টি।

সুন্দরবন ও উপকূলবর্তী অংশে মানুষের প্রধান প্রশ্ন বেঁচে থাকা। বাঁধ, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, নোনা জল, চাষের ক্ষতি, মাছধরার অনিশ্চয়তা—এসবই সেখানে রাজনীতির কেন্দ্রে। এই অঞ্চলে শাসকদলের সুবিধা সাধারণত বেশি, কারণ প্রশাসনিক উপস্থিতি, ত্রাণ, পুনর্গঠন এবং স্থানীয় সংগঠন এখানে বড় ভূমিকা নেয়। কিন্তু এই সুবিধা অটুট নয়। যদি মানুষ মনে করেন সুরক্ষা যথেষ্ট নয়, ত্রাণে বৈষম্য হয়েছে, বা দুর্যোগের পরে প্রতিশ্রুতি বাস্তবে নামেনি, তাহলে বিরোধীদের জন্য সুযোগ তৈরি হয়। এই বেল্টে বিজেপি কিছু আসনে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বী, কারণ শাসকদলবিরোধী ক্ষোভকে তারা ধরতে পারে। তবে পুরো অঞ্চলকে বিজেপির লড়াইয়ের অঞ্চল বলাও ঠিক হবে না, কারণ এখানে শাসকদলের সাংগঠনিক ও প্রশাসনিক ভিত্তি এখনও বেশি শক্তিশালী।

সেমি-আরবান বেল্টে ছবিটা অন্যরকম। বারুইপুর, সোনারপুর, রাজপুর, বজবজ, মহেশতলার মতো এলাকায় মানুষের উদ্বেগ মূলত প্রতিদিনের জীবনযাত্রা ঘিরে। রাস্তা, ড্রেনেজ, জল জমা, পানীয় জল, যাতায়াত, হাসপাতাল, স্কুল, জমির ব্যবহার বদল এবং দ্রুত বাড়তে থাকা জনবসতির চাপ—এই সবই এখানে ভোটের ইস্যু। এই অংশে শাসকদল এখনও এগিয়ে, কারণ তাদের সংগঠন, স্থানীয় প্রভাব এবং প্রশাসনিক যোগাযোগ মজবুত। কিন্তু এখানেই পরিষেবা-ভিত্তিক অসন্তোষও সবচেয়ে দ্রুত জমে। ফলে বিজেপি এই বেল্টের কিছু অংশে প্রধান চ্যালেঞ্জার হিসেবে উঠে আসে। আবার কিছু জায়গায় বাম সীমিত হলেও বিরোধী পরিসরে উপস্থিত থাকে। তাই এই অংশে লড়াই অনেক সময় সরাসরি একমুখী নয়; বরং কোন বিরোধী শক্তি শাসকদলবিরোধী ভোট বেশি টানতে পারছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

যাদবপুর-টালিগঞ্জ-লাগোয়া শহুরে বেল্টে ভোটের মানসিকতা আরও ভিন্ন। এখানে নাগরিক পরিষেবা, রাজনৈতিক ব্যবহার, ভাবমূর্তি, মধ্যবিত্তের মানসিকতা এবং গ্রহণযোগ্য বিকল্পের প্রশ্ন একসঙ্গে কাজ করে। এই অংশে তৃণমূল এগিয়ে থাকলেও বিরোধী পরিসর একক নয়। বিজেপির উপস্থিতি আছে, কিন্তু সব ক্ষেত্রে তারাই একমাত্র চ্যালেঞ্জার নয়। বামেরও কিছু রাজনৈতিক স্মৃতি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং শহুরে বৌদ্ধিক পরিসরে প্রভাব এখনও পুরোপুরি মুছে যায়নি। ফলে এই বেল্টে লড়াই কখনও তৃণমূল বনাম বিজেপি, কখনও তৃণমূল বনাম বাম-ঘেঁষা অসন্তোষ, আবার কখনও বিরোধী ভোটের ভাঙনের লড়াই হয়ে ওঠে।

ভাঙড়কে অবশ্যই আলাদা করে দেখতে হয়। এখানে সাধারণ তৃণমূল-বিজেপি সমীকরণ পুরোপুরি খাটে না। জমি, স্থানীয় প্রভাব, মুসলিম ভোটের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ, সংঘর্ষের স্মৃতি এবং বিকল্প নেতৃত্বের প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ভাঙড়ের রাজনৈতিক ভাষা আলাদা। এখানে বিজেপি উপস্থিত থাকলেও প্রধান লড়াইয়ের কেন্দ্রে সবসময় থাকে না। শাসকদলের সামনে এখানে মূল চ্যালেঞ্জ অনেক সময় স্থানীয় বিকল্প শক্তি। এই কারণেই ভাঙড় গোটা জেলার মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক ক্ষেত্রগুলির একটি।

মহেশতলা-মেটিয়াবুরুজ বেল্টের বাস্তবতাও আলাদা। এখানে ঘনবসতি, ছোট ব্যবসা, অনানুষ্ঠানিক শ্রম, নাগরিক পরিষেবার চাপ, রাস্তা, ড্রেনেজ, আবাসন এবং স্থানীয় নেটওয়ার্ক রাজনীতির কেন্দ্রে। এই অংশে তৃণমূল ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী, কারণ তাদের সংগঠন ও স্থানীয় যোগাযোগ গভীর। কিন্তু একই সঙ্গে এখানেই অসন্তোষও দ্রুত জমে, কারণ মানুষের সমস্যা প্রতিদিনের এবং প্রত্যাশাও অনেক বেশি। মহেশতলার মতো অঞ্চলে বিজেপি লড়াইয়ে থাকতে পারে, বিশেষত যদি স্থানীয় ক্ষোভ বাড়ে। অন্যদিকে কিছু এলাকায় বাম আলোচনায় থাকলেও মূল লড়াইয়ের কেন্দ্রে থাকে না। ফলে এখানকার চিত্রও একমাত্রিক নয়।

সব মিলিয়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনার সামগ্রিক ছবিতে তৃণমূলই এগিয়ে। কিন্তু এই এগিয়ে থাকা সব অঞ্চলে একরকম নয়। সুন্দরবনে তাদের সুবিধা বেশি, সেমি-আরবান বেল্টে বিজেপি কিছু জায়গায় চাপ তৈরি করতে পারে, শহুরে বেল্টে বিজেপি ও বাম—দু’পক্ষই ভিন্নভাবে উপস্থিত, আর ভাঙড় একেবারে আলাদা সমীকরণে চলে। এই জেলার নির্বাচনকে তাই শুধু তৃণমূল বনাম বিজেপি, বা শুধু তৃণমূল বনাম বাম—কোনও একক ছকে ফেলা যায় না।

যে ক’টি আসনে লড়াই তুলনামূলকভাবে বেশি টানটান হতে পারে, তার মধ্যে ভাঙড় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর পরে যাদবপুর, টালিগঞ্জ, সোনারপুর দক্ষিণ, সোনারপুর উত্তর, মহেশতলা, বারুইপুর পশ্চিম, পাথরপ্রতিমা, কাকদ্বীপ, সাগর, ডায়মন্ড হারবার, সাতগাছিয়া এবং বজবজ বিশেষভাবে নজরে রাখার মতো। তবে এদের প্রত্যেকটিতে লড়াইয়ের চরিত্র এক নয়। কোথাও শাসকদল বনাম বিজেপি, কোথাও শাসকদল বনাম বাম, আর কোথাও শাসকদল বনাম স্থানীয় বিকল্প শক্তি—এই জেলায় সব ধরনের সমীকরণই একসঙ্গে দেখা যায়।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার আসল রাজনৈতিক বার্তা হল, এখানে একটিমাত্র ভোট হয় না। এক জেলার ভিতরে বহু রকম বাস্তবতা, বহু স্তরের প্রত্যাশা, বহু ধরনের অসন্তোষ এবং বহু আলাদা লড়াই একসঙ্গে ফল তৈরি করে। যে দল এই জেলাকে একরকম ভেবে পড়বে, সে ভুল করবে। যে দল বুঝবে কোথায় বাঁচার প্রশ্ন, কোথায় পরিষেবার প্রশ্ন, কোথায় গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন, আর কোথায় স্থানীয় ক্ষমতার প্রশ্ন—সুবিধা শেষ পর্যন্ত তারই হবে।

Leave a Reply